
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা প্রদান করা হলেও এর সূচনা হয়েছিল ১৮৫৩ সালে চার্লস গ্র্যান্টের বিশাল বঙ্গ প্রদেশকে দু-ভাগ করার সুপারিশের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ১৮৬৬ সালে বাংলার ছোট লাট স্যার উইলিয়াম গ্রে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, একজন ছোট লাটের পক্ষে বাংলার দায়িত্ব পালন অত্যন্ত কঠিন। ১৮৭২ সালে জর্জ ক্যাম্পবেল ও একই মত প্রকাশ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৩ সালে প্রথমবারের মতো প্রদেশ ভাগের কথা ঘোষণা করা হয়। ১৯০৪ সালে বড়লাট লর্ড কার্জন পূর্ববঙ্গ সফর করেন এবং বলেন, পূর্ববঙ্গে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ সৃষ্টি করা হবে এবং এর রাজধানী হবে ঢাকা।
এক বছর পর, ১৯০৫ সালের ১৯ জুলাই বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা প্রদান করা হয় এবং ১৬ অক্টোবর থেকে তা বাস্তবায়ন করা হয়। নবগঠিত প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিযুক্ত হন স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার।
বঙ্গভঙ্গের কারণ হিসেবে দেশীয় কিছু লেখক ব্রিটিশদের "ভাগ কর ও শাসন কর" নীতি উল্লেখ করলেও এর পেছনে একটি বাস্তব কারণ ছিল। যেমন — একজন ব্যক্তির পক্ষে পুরো বঙ্গ প্রদেশ পরিচালনা কঠিন ছিল, তাই একে ভাগ করে নতুন প্রদেশ গঠন আবশ্যক ছিল। তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে অগ্রসর রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল বাংলা, আর একে দুর্বল করতে পারলে ব্রিটিশদের ভারত শাসন নিরাপদ হতো। উল্লেখ্য, পূর্ব বাংলা ও আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল মুসলিম, আর পশ্চিম বাংলার জনগণ ছিল হিন্দু। দুই বাংলা ভেঙে এই দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করাও ছিল ব্রিটিশদের লক্ষ্য। এছাড়াও হিন্দু জমিদারদের ওপর ক্ষুব্ধ ও নতুন প্রদেশে সুযোগ-সুবিধার আশায় মুসলমান জনগণ বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থন জানায়।
বঙ্গভঙ্গের ফলে ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের মাঝে নবচেতনার উন্মেষ ঘটে; বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তারা নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পায়। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পর মুসলমানরা নিজেদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরির মানসে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন করে, ফলে মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠে। পূর্ব বাংলাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম দুই গোষ্ঠী বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়ে। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে এবং বোমা হামলায় অনেক নর-নারী নিহত হয়। বঙ্গভঙ্গের কারণে বিক্ষুব্ধ অংশ, বিশেষত হিন্দুরা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু করে।
হিন্দুদের প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। ফলে মুসলমানদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়, তখন ব্রিটিশদের প্রতি মুসলমানদের অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। মুসলমানরা বুঝতে পারে, ব্রিটিশ বা হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না, কাজেই ভিন্ন পথে অগ্রসর হতে হবে। মুসলমান জনগণ বুঝতে সক্ষম হয়, আপস নয়, সংগ্রামের পথ ধরেই তাদের উন্নতি ও স্বাধীনতার পথে যাত্রা করতে হবে।
বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব থেকে যায়, যা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সূচনা করে।
Sign in to leave a comment.