
উমাইয়া খিলাফতের তখন স্বর্ণযুগ। দামেশকের মসনদে খলিফা আল-ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক। উত্তর আফ্রিকার গভর্নর মূসা বিন নুসাইরের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বিশাল অঞ্চল জয় করে মরক্কো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মরক্কোর ওপারেই রয়েছে স্পেন।
স্পেনে তখন গথ রাজা রডারিকের শাসন। সেখানে খ্রিস্টান শাসকদের অত্যাচার চরমে পৌঁছেছে — প্রজাদের স্বাধীনতা, অধিকার, মর্যাদা কিছুই ছিল না। এই অরাজকতা ও নিপীড়নের মধ্যে মুসলমানদের স্পেন বিজয় তখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূসা বিন নুসাইরের মনেও ছিল স্পেন জয়ের বাসনা।
এমন সময় সিউটার গভর্নর কাউন্ট জুলিয়ান মূসার কাছে এলেন। তিনি স্পেন অভিযানের আমন্ত্রণ নিয়ে এসেছেন। স্পেনের রাজপ্রথা অনুসারে জুলিয়ান তার পরম সুন্দরী কন্যা ফ্লোরিন্ডা (বা লা কাভা) কে রাজকীয় শিক্ষা ও রীতিনীতি শেখার জন্য রাজা রডারিকের দরবারে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু রডারিক তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। এই অপমান ও অত্যাচারে ক্ষুব্ধ জুলিয়ান বুঝতে পারেন — তার মেয়ে যদি রাজদরবারে নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ প্রজাদের কী হবে! প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তিনি মুসলিমদের স্পেন অভিযানের আমন্ত্রণ জানান।
মূসা প্রথমে এটাকে রডারিকের চাল বলে সন্দেহ করলেন। কিন্তু জুলিয়ানের কথায় বিশ্বাস হলে খলিফার অনুমতি নিয়ে প্রথমে তারিফ বিন মালিকের নেতৃত্বে ৫০০ সৈন্যের একটি দল পাঠান স্পেনের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য। তারা ফিরে এসে ইতিবাচক তথ্য দিলে মূসা তার বিশ্বস্ত সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে স্পেন অভিযানে প্রেরণ করেন।
৭১১ খ্রিস্টাব্দে (৯২ হিজরি) রমজান মাসের প্রথম দিকে তারিক বিন জিয়াদ ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে মরক্কো থেকে যাত্রা করেন। তারা কাল্পে পর্বতের (জাবাল তারিক বা জিব্রাল্টার) পাদদেশে জাহাজের নোঙর করেন। সেখান থেকে আরজেসিরাস শহর জয় করে নেন। পরাজিত খ্রিস্টান সেনাপতি টুডমির রাজা রডারিককে সংবাদ পাঠান। রডারিক আরও সৈন্য পাঠান, কিন্তু তারাও পরাজিত হন।
অবশেষে রডারিক নিজে ১ লক্ষ সৈন্য নিয়ে টলেডো থেকে যাত্রা করেন। ওয়াদি লাক্কা (গুয়াদালেতে নদীর তীরে) সিডনিয়া শহরের কাছে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়।
তারিক দেখলেন তার সৈন্যরা শত্রুর বিশাল সংখ্যা দেখে কিছুটা ভীত। তিনি আদেশ দিলেন সকল জাহাজ জ্বালিয়ে দেওয়ার। আগুনের লেলিহান শিখা উঠলো সমুদ্রতীরে। তারপর তিনি তার বিখ্যাত ভাষণ দিলেন:"হে আমার সহযোদ্ধারা!তোমাদের সামনে শত্রুসমুদয়, পেছনে অথৈ সমুদ্র। পালাবার কোনো পথ নেই। এখন তোমাদের সামনে দুটি পথ: হয় যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করবে, নয়তো শাহাদাত লাভ করবে। কাপুরুষের মতো সমুদ্রে ডুবে মরার কোনো অর্থ নেই। আল্লাহর উপর ভরসা রাখো, তিনি আমাদের সাহায্য করবেন!"
এই ভাষণে মুসলিম বাহিনী আগুনের মতো জ্বলে উঠল। আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে মাত্র ১২ হাজার যোদ্ধা ১ লক্ষের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। টানা কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনীর বিজয় হলো। রাজা রডারিক পালাতে গিয়ে নিহত হলেন।
এই ওয়াদি লাক্কার বিজয় মুসলিমদের মনোবল আকাশছোঁয়া করে দিল। তারিক বাহিনীকে পুনরায় সংগঠিত করে একের পর এক শহর জয় করতে লাগলেন — মালাগা, সেভিল, কর্ডোবা, মুরসিয়া, বার্সেলোনা... অবশেষে রাজধানী টলেডো পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন।
এভাবে অত্যাচারী গথ রাজশক্তির পতনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায় —"আল-আন্দালুস"।
Sign in to leave a comment.