
শবে বরাত সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশ্নের আলোকে লেখার চেষ্টা করেছি। যাতে করে আমাদের মনের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর চলে আসে।
প্রথমত, শবে বরাত কী?
'শবে বরাত' ফারসি শব্দ। 'শব' মানে রাত আর 'বরাত' মানে মুক্তি বা ভাগ্য। ইসলামি পরিভাষায় একে বলা হয় 'লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান' বা শা'বান মাসের মধ্যরজনী। হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে শা'বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটিই শবে বরাত হিসেবে পরিচিত। (সংক্ষিপ্ত)
কেন এই রাতের এত গুরুত্ব?
শবে বরাতের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা। হাদিস অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আকাশে বিশেষ রহমত নিয়ে মনোনিবেশ করেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন—
"আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা শা‘বানের মধ্যরজনীতে (নিসফ শা‘বান) তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসাকারী ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন।(ইবনে মাজাহ: ১৩৯০; শু‘আবুল ঈমান: ৩৫৫২)"
"কে আছো এমন , আমার কাছে চাইবে; আমি তোমার চাওয়া পূরণ করব। কে আছো এমন, আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে; আমি তোমায় ক্ষমা করে দিবো।(বুখারী:১১৪৫)"
মূলত উম্মতে মুহাম্মাদীকে পাপমুক্ত করার এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার জন্যই এই বরকতময় রাত দান করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আলেমদের মতে শবে বরাতের গুরুত্ব কেমন?
অধিকাংশ আলেম ও ফকীহদের মতে, শা'বান মাসের মধ্য রজনী বা শবে বরাতের বিশেষ ফজিলত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এই রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের ক্ষমা করেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.): এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে অনেক নির্ভরযোগ্য বর্ণনা রয়েছে। পূর্ববর্তী অনেক বড় আলেম এই রাতে বিশেষভাবে নফল ইবাদত করতেন।
মুফতি তাকি উসমানি: এটি আল্লাহর রহমত ও সাধারণ ক্ষমার রাত। তবে ক্ষমা পাওয়ার শর্ত হলো—অন্তরকে শিরক ও হিংসা থেকে মুক্ত রাখা।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.): তিনি এই রাতকে তাকদির ও রহমতের ফয়সালার রাত হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তৃতীয়ত,শবে বরাতে মুমিনদের করণীয় কী?
শবে বরাত মূলত ইবাদত, তওবা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের রাত। এই রাতে মুমিনদের প্রধান কাজগুলো হলো:
১. তওবা ও ইস্তিগফার: এই রাতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে নিজের বিগত জীবনের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া। অন্তর থেকে অনুতপ্ত হয়ে ভবিষ্যতে পাপে না জড়ানোর অঙ্গীকার করা।
২. ব্যক্তিগত নফল ইবাদত: কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম বা নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত ছাড়াই সামর্থ্য অনুযায়ী নফল নামাজ আদায় করা। এই ইবাদতগুলো একাকী এবং নিভৃতে করা উত্তম।
৩. কুরআন তিলাওয়াত: অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করা, যা অন্তরে প্রশান্তি আনে এবং আল্লাহর নির্দেশনাবলী বুঝতে সাহায্য করে।
৪. জিকির ও দোয়া: বেশি বেশি সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়া এবং নিজের ও পুরো মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ চেয়ে আল্লাহর কাছে বিশেষ দোয়া করা।
৫. হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত হওয়া: হাদিস অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহ শিরককারী এবং অন্যের প্রতি হিংসা পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করেন। তাই অন্তর থেকে সবার জন্য ক্ষমা ও ভালোবাসা পোষণ করা জরুরি।
৬. পরদিন রোজা রাখা: শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা সুন্নাত। সেই হিসেবে ১৫ই শাবান (শবে বরাতের পরদিন) নফল রোজা রাখা অনেক আলেম উত্তম মনে করেন।
৭. কবর জিয়ারত: রাসূল (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছিলেন। তাই সম্ভব হলে আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করে তাদের মাগফিরাত কামনা করা যেতে পারে (তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়)।
তবে আমাদের অনেকগুলো বর্জনীয় দিক রয়েছে: তা হলো শবে বরাত উপলক্ষে আলোকসজ্জা, আতশবাজি বা হালুয়া-রুটি নিয়ে মেতে ওঠার মতো কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। ইবাদত হতে হবে একান্ত এবং বিনম্র।
সর্বোশেষ শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো:
ক্ষমা ও ইবাদতের মধ্যদিয়ে রমজানের প্রস্তুতি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রহমতের মাস রমজান সমাগত। তাই হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে নিজেকে পবিত্র করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই এই রাতের সার্থকতা।
Sign in to leave a comment.